Skip to content Skip to footer

nobijir biye

…..তর্ক করে দুঃখ ছাড়া

কি পেয়েছিস অবিশ্বাসী

তর্ক ছেড়ে দেখনা বার এক

হযরতে মোর ভালোবাসি…..

আমার হয়েছে এক বিপদ। শিক্ষকতা করি, বিধায় ভাল মন্দ যে কোন কথা কেউ বলতে আসলেই নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আমাকে সেক্যু, অমুসলিম আর অবিশ্বাসীদের মাঝে যেগুলোর  মাথামোটা সেগুলোর কাছে সবচেয়ে বেশি যে কথা শুনতে হয়েছে তা হল–

‘তোর আদর্শ তো ৬ বছরের মেয়ে বিয়ে করা নবীর আদর্শ’!!!!

এ প্রশ্নটা শুনলে আমার অতীতের যে কথাসকল মনে পড়ে, তা হল—

যখন হৈমন্তী পড়েছিলাম রবিঠাকুরের, তখন জানলাম রবির সমাজে বিয়ের বয়স ১৭-১৮ মানে ভয়াবহ ব্যাপার, ১০ এর পরেই আইবুড়ো। সমাজে এমন পাত্রীর তেমন কদর নেই। এতো মাত্র ১০০ বছর আগের সমাজের কথা। মৈত্রেয়ী দেবীর সাথে যখন মির্চার উথাল পাথাল প্রেম মৈত্রেয়ীর বয়স তখন ১৩-১৪ র বেশি না, আর মির্চা তো বড় বড় পাশ শেষ করে পিএইচডি করতে এসেছে। এটাও গত শতকের কথাই। যার আইউইটনেস এখনোও দু চারজন খুজে পাওয়া যাবে বা সে সময় জন্ম হয়েছিল এখন বৃদ্ধ।

আচ্ছা আপনাদের লজিক কি বলে ১০০ বছর আগে যে মেয়েদের বিয়ের বয়স এত কম ছিল, সিনেমা বানানো হলে নাম দেয়া যেত বালিকাবধূ এসব কি রূপকথা, কল্পনা কাহিনী না কি বাস্তবতা! ১০০ বছরের ইতিহাস যদি বালিকা বধূকে সমর্থন করে আপনাদের মুক্ত চিন্তা ও যুক্ত বুদ্ধি কি বলে, ১৪০০ বছর আগে সেই হিসেবে বিয়ের বয়স বিশেষত মেয়েদের বিয়ের বয়স কত হতে পারে???৬/৯ হওয়াটা খুউবই কি দৃষ্টিকটু, অসমর্থনযোগ্য!!

আমি আমার অনুমান থেকে কোন কথা লিখি না যা দেখেছি জীবনে, তা থেকেই লিখি। আমার ঠাকুমার(দাদী) মানে আমার বাবার মায়ের বিয়ে হয়েছিল ৯ বছর বয়সে, আর ঠাকুমার পিসী/ ফুপুর বিয়ে হয়েছিল ৬ বছরে। ঠাকুমার মুখে গল্প শুনেছিলাম, একদিন ফুপুর সাথে বাসার সামনে খেলছিলেন, এমন সময় ফুপুর বর শ্বশুড়বাড়িতে আসলেন। তা শুনে ফুপু গায়ে জড়ানো গামছা খুলে মাথায় বউ দিয়েছিলেন। এই গল্প বলে বড় হয়ে সেই ফুপুকে ঠাট্টা করা হতো। এতই পিচ্চি ছিলেন যে জামাইয়ের সামনে মাথায় বউ দিতে হয় জানতেন, কিন্তু গায়ের কাপড় খুলতে লজ্জা পেতে হয় জানতেন না🙈, এটাকে আবার কেউ যৌনতা ভাববেন না, এটা ছিল নিছকই ছোট বাচ্চা মেয়ের মনস্তত্ত্ব, আর এটা হাজার হাজার বছরের আগের না, মাত্র ১১৭ বছরের আগের কাহিনী।

আচ্ছা আপনাদের যুক্তিতে কি বলে!! মাত্র ১১৬-১৭ বছর আগে যা স্বাভাবিক ছিল, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী আসার বহুপরেও বাঙালী সমাজের পরিবারগুলোতে যা বিদ্যমান ছিল, নোবেলপ্রাপ্ত সাহিত্যিকের রচনায় সমাজের যে চিত্র বর্ণিত হয়েছে, সেখানে ১৪০০ বছর আগের সেই ঘটনাকে আপনার অযৌক্তিক লাগার কারণ কি? আপনারা যখন কটাক্ষ আর অতিযুক্তিতে কথা বলেন, তখন আমার যা মনে হয় উচ্চ মাধ্যমিকে বাংলা সাহিত্যে আপনি টুকলি করেছিলেন। যে প্রশ্নে ‘হৈমন্তী গল্পে যে সমাজের চিত্র’ তুলে ধরার কথা বলা হয়েছিল তার উত্তর আপনি কোনভাবেই পড়েননি বা আসলে শুধুই মুখস্ত করেছিলেন আর পরীক্ষার হলে উগরে দিয়েছিলেন। মির্চা যখন পড়েছেন তখন ঐ হারাম কথাগুলোয় এতগুরুত্ব দিয়েছিলেন যে মৈত্রেয়ীর বয়সের দিকে খেয়াল করেননি!!

এবার আসি অন্যদিকে। ১৪০০ মানে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আরবীয় আয়েশা (রা) এর বিয়ে অন্য গোত্রে ঠিক হয়ে ছিল। কিন্তু সেই গোত্রের ওরা ইসলাম  গ্রহণ করেননি। আয়েশা(রা) এর পরিবার ইসলাম গ্রহণ করায় তারা বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়।  ওনার পিতামাতা অমুসলিমের সাথে বিয়ে দেয়ার চেয়ে মুসলিম ও রাসূলকে জামাই বানানোকে যুক্তিযুক্র ভেবেছে। এরপর রাসূল সা এর সাথে আকদ হয়। আকদ মানেই সে সমাজে বৈবাহিক জীবন শুরু হতো না, বৈবাহিক জীবন শুরু হতো রুকসাতের পরে। আকদের ও প্রায় তিন বছর পর হিজরত করে মদীনায় চলে যায়। সেখানে অধিকাংশ মুহাজির অসুস্থ হলে আয়েশা(রা) এর পিতাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার সেবা শুশ্রূষার দায়িত্ব নেন আয়েশা(রা)। এরপর পিতা সুস্থ হলে তিনি নিজে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই জ্বরে আয়েশা(রা) মাথার চুল পড়ে যেতে থাকে। এতে পিতা রাসূলের কাছে রুখসাতের কথা বলেন। এভাবে প্রায় সাত আট মাস পাড় হওয়ার পর প্রায় ১১ বছর বয়সে রুখসাত হয় আয়েশা (রা)’র। অর্থাৎ  এই বয়স থেকেই বৈবাহিক জীবনের সূচনা হয়।

হিসেব মতে ১১৭ বছর আগের সমাজের আমার ঠাকুমা আয়েশা রা এর চেয়েও ২ বছর ছোট থাকতে বৈবাহিক জীবন শুরু করেন। অথচ আপনাদের নবীপত্নীর নামেই গায়ে ফোসকা পড়ে!

আচ্ছা যে মেয়ে অসুস্থ বাপের সেবার দায়িত্ব নেয় তার কি সংসারের দায়িত্ব নেয়া খুউবই অবাস্তব! ওরা কি আমার আপনার মতো ছিল, যে ৩০ বছর বয়সেও ভাজা মাছ উল্টাতে পারতো না, মায়ে ভাত মাখায় মুখে ঢুকায় দিলে খাইতো নয় ইনস্ট্যান্ট নুডুলস সিদ্ধ করতো। নারে ভাই, ওরা ৮-৯ বছরেই সংসারের কাজ, অসুস্থের সেবা, লেখাপড়া, জ্ঞানদান সবই করতো।  আমাদের মতো আকাইম্যা ছিল না যে এক লেখাপড়া করতে যায়ে ৩০ বছর বয়সেও বুয়ার হাতের রান্ধা খাবার খাইতে হয়।।

আয়েশা রা যখন ১৪০০ বছর আগে মাত্র বৈবাহিক জীবন শুরু করেছিলেন, আমার ঠাকুমা ৯ বছর বয়সে বিবাহ করে ততদিনে দুই বাচ্চার মা। সেই সংসার করে ১২ টা বাচ্চা জন্ম দিয়ে অল্প বয়সে বিধবা হয়ে ৫ সন্তানের মৃত্যু সহ্য করে প্রায় ১০৩ বছর বয়সে সর্বাঙ্গ সুস্থ থেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। অল্প বয়সে বিয়ে তার শরীরের জন্য কোন ঝুঁকি আনে নাই। আয়েশা রা ১৮ বছরে আর আমার দাদী ২৫/২৬ বছরে বিধবা হয়েছেন। দুজনেই আমৃত্যু সুস্থ ছিলেন। অথচ আইজকে জন্ম নিয়া দুই তিন পাতা হাবিজাবি ইংরেজি নোট (বইও না) পড়িয়া নিজেকে জ্ঞানী ভাবা লোকজন সমানে এইসব নারীদের, তাদের বিবাহের বয়স, তাহাদের অর্ধাঙ্গকে নিয়ে কটাক্ষ করে যখন ফেসবুকে বন্যা এনে দেয়, তখন মনে হয় কি আছে আপনাদের জীবনে, ওয়েল স্টাবলিশড হয়ে যখন আপনার প্রথম সন্তান হামাগুড়ি দেবে, আপনিও কোমড়ের ব্যাথায় হামাগুড়িই দেয়ার উপযুক্ত হবেন, সন্তান খাড়া হইতে হইতে আপনার পটল তোলার সময় আসিয়া পড়িবে৷ নাতী নাতনীর হামাগুড়ি দেখিবেন কেমন করিয়া?? অথচ আমার ঠাকুমা ৯ বছরের বালিকাবধূ নাতিদের বিয়ার কাচ্চিও খেয়ে মোলো।

আমি বাংলাদেশের সাহিত্যে, প্রবন্ধে, গল্পে, নিজের পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠদের অভিজ্ঞতায় ৬/৯/১১ বছরের কন্যা বিয়ে করাকে একাধিকবার খুঁজে পেয়েছি, এসব আমার কাছে পরিচিত গল্প তাও ১৪০০বছর আগের না বরং মাত্র ১০০-১৫০ বছর আগের। এসব শুধু গল্পই না এই চরিত্রের অনেককে আমি নিজে পান বানিয়ে দিয়েছি, এদের হাতের বানানো নারু মোয়া আচার খেয়েছি এই কদিন আগেও। তাই আপনারা যখন ছি ছিক্কার করেন আমার মনে হয় আপনাদের পূর্বপুরুষের বাস্তব জীবন সম্পর্কে কোন ধারণাও পাননি আপনারা।

শুধুই বিরোধিতার স্বার্থে কথা বললেই তা সারমেয় হবে তা নয়। কোন বিষয়ে কথা বলতে গেলে, বিরোধিতা করতে গেলে সেই ঘটনাকাল সংঘটনের সময়ের, সেই সমাজের পটভূমির দিকে আলোকপাত করতে হয়। ইতিহাস, সমাজের অবস্থা, সন তারিখ, সে সমাজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবনযাপনকে আমলে নিতে হয়।

আসলে আপনাদের অতিযৌক্তিক! কথাগুলো থেকে যাবে, নিজের জীবন দিয়ে একদিন সঠিকটা বুঝে যাবেন ঠিকই কিন্তু সেদিন আর ফিরে আসার অবস্থা থাকবে না 🌷🌷🌷

[বিঃদ্রঃ এই লেখাটা কোন ধর্মীয় দৃষ্টান্ত নয়, সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। এখানে আলোচিত দুটি ভিন্ন চরিত্র শুধুমাত্র আলোচনার সুবিধার্থে একত্রীকরণ করে ব্যবহৃত হয়েছে এটা বোঝাতে যে মাত্র ১০০ বছর আগেও অল্প বয়সী মেয়ে বিয়ে করাটা সমাজের কাছে স্বাভাবিকই ছিল, মাত্র দুই জেনারেশন এসেছে যারা কুড়িতে বুড়ি হয়ে বিয়ে করেছে]

© রিতু কুন্ডু

  সহকারি অধ্যাপক

  জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply