একদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উমরের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হাত ধরলেন। রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন ব্যবহার ছিলো খুবই রেয়ার। উমর (রা:) আপ্লুত হয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার নিজের পরে আপনিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।”উমরের (রা:) কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন:“না, যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! তোমার কাছে আমি যেন তোমার চেয়েও প্রিয় হই!।”উমর (রা:) বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বললেন, “আল্লাহর কসম! এখন থেকে আপনি আমার কাছে আমার নিজের চেয়েও প্রিয়।”উমরের (রা:) কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুশি হয়ে তৎক্ষণাৎ তাঁর ঈমান পূর্ণাঙ্গতার সার্টিফিকেট দিলেন- “উমর! এখন তুমি সত্যিকারের ঈমানদার হলে।” [সহীহ বুখারী: ৬৬৩২]আরেকটা হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:“তোমাদের কেউ ততোক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবে না, যতোক্ষণ না তার নিকট আমি তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষের অপেক্ষা প্রিয় হই।” [সহীহ বুখারী: ১৫]এই হাদীসকে সামনে রেখে আমরা একটু ইমোশনাল আর্গুমেন্টে যাই। আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা কে? কার কথা মনে হলে আমি তার মতো হতে চাই? কাকে আমার রোল মডেল হিশেবে আমি গ্রহণ করেছি?আমাদের সমাজের বাস্তবতা হলো আমরা একজন প্লেয়ার, একজন অভিনেতাকে রোল মডেল হিশেবে গ্রহণ করি। আমরা কিভাবে পোশাক পরবো, কোন শ্যাম্পু ব্যবহার করবো, কোন ক্রিম ব্যবহার করবো, কোন গাড়ি কিনবো সবকিছুতে আমরা প্রভাবিত হচ্ছি হয় প্লেয়ার দ্বারা নতুবা অভিনেতা দ্বারা। বিজ্ঞাপনগুলোর জন্য বাছাই করে তাদেরকেই নেওয়া হয়। যার ফলে সেলুনে গিয়ে আমরা বলি অমুক প্লেয়ারের স্টাইলে চুল কেটে যাও, নতুন রিলিজ হওয়া মুভির নায়কের হেয়ার স্টাইল আমি চাই-ই-চাই। ছেঁড়া প্যান্ট পরি, কারণ অমুক নায়ক অমুক মুভিতে ছেঁড়া প্যান্ট পরেছে, এটা এখন ফ্যাশন হয়ে গেছে।ঐসব করা হারাম কি-না সেই প্রশ্নে না গিয়ে খুব সিম্পল একটা প্রশ্ন আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করবো- আমার হৃদয়ের মসনদে কার স্থান? আমার হৃদয়ে কার বাসস্থান?কারণ, যিনি আমার হৃদয়ে থাকবেন, বিনা প্রশ্নে আমি তাঁকে মেনে নেবো। কোনো প্লেয়ার, কোনো অভিনেতা ঘোষণা দেন না ‘আমার ফ্যান হতে হলে তোমাকে এভাবে চুল কাটতে হবে’। তবুও আমরা তাদের মতো চুল কাটি। কেনো? কারণ, তারা আমাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। কোনো নির্দেশনা ছাড়াই, কোনো প্রশ্ন ছাড়াই আমরা তাদের মতো হতে চেষ্টা করি।হালাল-হারামের প্রশ্ন অনেক পরে। একজন হিন্দু, একজন খ্রিস্টান, একজন ইহুদিকে কি আমরা বলবো- “তুমি মদ খেয়ো না, মদ খাওয়া হারাম?” বলবো না। কারণ, তার ঈমান-ই তো নাই, তার আবার কিসের হারাম-হালাল! আগে তাকে ঈমানের আহ্বান জানাতে হবে, অতঃপর হারাম-হালালের নসীহত।রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর ঈমান আনা, তাঁকে নবী বলে স্বীকার করা, শেষ নবী বলে মেনে নেওয়া যেমন আমাদের ঈমানের পূর্বশর্ত; তেমনি তাঁকে সর্বোচ্চ ভালোবাসাটাও ঈমান পরিপূর্ণ হবার আলামত। নিজের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন এমনকি নিজের চেয়েও রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালোবাসতে হবে।এটার মানে কী?দাঁড়ি রাখতে গেলে সর্বপ্রথম বাধা আসে পরিবার, আত্মীয়স্বজন থেকে। বন্ধুদের টিটকারি শুনতে হবে, বান্ধবী থাকলে বান্ধবী হারানোর সম্ভাবনা আছে। ক্যারিয়ারের চিন্তা করলে দাঁড়ি রাখলে ‘ভালো চাকরি’ না-ও জুটতে পারে। এতোকিছুর পর আমি শুধু একটা কথাই জানি- আমার রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাঁড়ি রেখেছেন। এতো বাধা উপেক্ষা করে, পরিবার-সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যদি আমি দাঁড়ি রাখি, এটাই হলো সবার চেয়ে রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রাধান্য দেওয়া।আমাকে গালাগালি করলে আমি কষ্ট পাই, আমার মা-বোনকে কটুক্তি করলে আমি মনঃক্ষুণ্ন হই। আমার রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিয়ে কেউ কটু কথা বললে কি আমি ব্যথিত হই? আমার মা-বোনকে নিয়ে কটু কথা বলায় আমি যে রি-অ্যাক্ট করি, রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেলায়ও কি একইরকম রি-অ্যাক্ট করি?আমি যদি মেসির ফ্যান হই, রোনালদোর ফ্যানরা চাইবে রোনালদো কে সেরা প্রমাণ করতে। আমি সেটা মেনে নিতে পারি না। আমি কী করি? যুক্তিপ্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করি- মেসিই সেরা। আজ অনলাইনে-অফলাইনে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদর্শের নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, সেক্যুলার, লিবারেল, বাম-রাম তাদের আদর্শকে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদর্শের উপর স্থান দিচ্ছে, প্রমাণ করতে চাচ্ছে। আমার ভূমিকা কী? আমি কি রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদর্শ সুন্দরভাবে, যুক্তিসম্মত উপায়ে উপস্থাপন করছি?এই সবগুলো প্রশ্নের মূল প্রশ্ন কিন্তু একটাই। আমি রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালোবাসি কি-না? ভালোবাসার দাবীদার বলে নিজেকে প্রমাণ করা না; বরং কথায়-কাজে সেটার প্রমাণ দেওয়া।রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালোবাসবো কিভাবে? তিনি তো আমাদের মাঝে অনুপস্থিত। তার একটাই উপায়- তাঁর সম্পর্কে ভালোমতো জানা। আলি ইবনে হুসাইন ইবনে আবি তালিব বলেন:“(ছোটোবেলায়) আমাদেরকে এমনভাবে সীরাহ পড়ানো হতো, যেভাবে কুরআন পড়ানো হয়।”যাকে নিজের সবটুকু উজাড় করে ভালোবাসাটা আমাদের ঈমান পূর্ণ হবার পূর্বশর্ত, তাঁর সম্পর্কে আমরা কতোটুকু জানি? যার সম্পর্কে আমরা জানিই না, তাঁকে ভালোবাসবো কি করে?আমরা কি সেই লাইফটা অনুসন্ধান করছি? সেই জীবনকাহিনী নিয়ে কি আমরা দু-চারটা বই পড়েছি? তাহলে আমরা কিসের ‘নবীপ্রেমী’ বলে দাবি করি!?সৃষ্টিকর্তা আছেন কি নেই সেই প্রশ্নের জবাবে না গিয়ে আল্লামা ইকবাল (রাহিমাহুল্লাহ) এক নতুন বয়ান নিয়ে আসেন-‘You may deny God, but how can you deny Muhammad (PBUH)?’হ্যাঁ, তুমি আল্লাহকে দেখছো না বলে তুমি অস্বীকার করছো, কিন্তু মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তুমি কিভাবে অস্বীকার করবে? তাঁর জীবনী তো তোমার সামনে উপস্থিত।আজকে আমরা যে বার্সা-রিয়াল চিনি, একসময় সেই অঞ্চলগুলোতে মুসলিমরা ছিলো। তখন পুরো অঞ্চলের নাম ছিলো আন্দালুস। সেই আন্দালুসের একজন স্কলারের নাম ইবনে হাজম আন্দালুসী (রাহিমাহুল্লাহ)। তিনি বলেন,“যদি নবিজীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ কোনো মিরাকল/মুজিজা না দিতেন, তাহলে তিনি যে সত্য নবী/ট্রু প্রফেট, এটা বুঝার জন্য তার লাইফটাই যথেষ্ট ছিলো।”সেই নবীর জীবনী পাঠে-শুনতে আমাদের আগ্রহ কতোটুকু?যারা রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনী পড়তে চান, এখনো শুরু করেননি বা শুরু করছেন কিন্তু আগাতে পারেননি তাদের জন্য আমার কিছু সাজেশন আছে। কোন বই দিয়ে আমরা শুরু করছি সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ (এটা নিয়ে একবার লিখেছিলাম, লিংক কমেন্টে দেবো)। বিস্তারিত ঐ পোস্টে পড়ে নিবেন, আপাতত তিনটি বইয়ের কথা বলছি।একেবারে প্রথমবারের মতো শুরু করতে হলে:তোমাকে ভালোবাসি হে নবী – গুরুদত্ত সিং।এটা পড়া হয়ে গেলে:মহানবী – মাজিদা রিফা।(এই বইটি থ্রিলার উপন্যাসের ঢঙ্গে রচিত। পড়ে মজা পাবেন)এবার একটু সিরিয়াস সীরাহ বইয়ের দিকে যাই। এই বইটা বাংলাভাষী সবার পড়া দরকার বলে আমি মনে করি। বাংলা ভাষায় মৌলিক এরচেয়ে ভালো সীরাহ আমার চোখে পড়েনি। সেটা হলো:সীরাহ – রেইনড্রপস।অনেকেই আছেন সীরাহ নিয়ে লেকচার দেখতে-শুনতে চান। সেক্ষেত্রে কেউ বাংলা ভাষায় দেখতে চাইলে আমার কাছে সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে রেইনড্রপস মিডিয়ার সীরাহটি। আমার জানামতে এটা একটা সীরাত অনুবাদ বা অবলম্বনে। মূলটা খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য হলে অন্তত বাংলাটা শুনতে পারেন (আমি মূল এবং বাংলা দুটোই শুনার চেষ্টা করেছি, দুটোই ফাইন)।বাংলা সীরাহর লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=f74nV31QXK4…যারা ইংরেজিতে শুনতে চান, আমার কাছে Memphis Islamic Center –এর সীরাহটি দেখতে পারেন। মোট ১০৪ পর্বের সীরাহ। ইংরেজিতে এরচেয়ে ডিটেইলস, চিত্তাকর্ষক সীরাহ আমি পাইনি (আরো তিনটি দেখেছিলাম)।লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=Y22vp9pp8JE…যাকে আমি ভালোবাসি বলে দাবী করি, শুরু হয়ে যাক তাঁকে জানার চেষ্টা। এই সাজেশনগুলো দিয়ে আমরা শুরু করবো, কিন্তু এগুলোই শেষ না।আরিফুল ইসলাম