Skip to content Skip to footer

রামাদান’ বরাবরই আমার কাছে ভীষণ প্রিয় একটা মাস, সেই ছোট্টবেলা থেকেই। আমাদের বাস ছিল ‘না শহর, না গ্রাম’ টাইপের একটা জায়গায়। বিশাল এক যৌথ পরিবারে। শাবান মাস থেকেই রোজার জন্য অপেক্ষা শুরু হয়ে যেত। বিশেষ করে সেই সময়টাতে খুব ঘটা করে ‘শবে বরাত’ পালন করা হত। শবে বরাতের পরদিন থেকে শুরু হত রমজানের প্রস্তুতি। রীতিমত উৎসব লেগে যেত। ঘরবাড়ি সব পরিষ্কার করা হত। মা-চাচীরা কাপড়-চোপড় কেচে-ধুয়ে সাফ করে ফেলতেন। ইফতারির জন্য বাসন-কোসন বের করা হত। সারা মাসের জন্য শুকনা বাজার, ছোলা,বুট, বেসন, তেল-নুন কিনে রাখা হত। ঠিক যেন বাড়িতে কোন ভিআইপি মেহমান আসবেন!

শাবান মাসের শেষদিনে রমজান মাসের চাঁদ দেখা মাত্রই পৌরসভা থেকে সাইরেন বাজানো হত। সাইরেন শুনেই মা-চাচীরা ভোররাতের জন্য রান্নার প্রিপারেশান নিতে বসতেন। আমি আর সমবয়সী কাজিন দাদীর কাছে বসে ইফতার আর রোজার নিয়ত শিখতাম! পুরুষ রা মসজিদে যেতেন, মহিলারা বাড়িতেই ‘সূরা তারাবি’ পড়তেন। ঘড়িতে আ্যালার্ম ফিক্স করে রাত্রে সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যেতেন। তখনও আমাদের বাড়িতে টিভি আসেনি, তাই কাউকে অযথা রাত জাগতেও হত না। এভাবেই শুরু হত আমাদের ‘রামাদান’।

নি:সন্দেহে সেই সময় আমাদের সব থেকে বড় আকর্ষণ ছিল ‘ইফতার’। আছরের পর আমি আর কাজিন মিলে বাড়ির পেছনের বাগান থেকে আইসকেল নামক এক ধরনের গাছের ডাল কেটে দাদীর জন্য মেসওয়াক তৈরি করতাম। নিজেরাও নিতাম। মেসওয়াক শেষে ওজু করে একটা ওড়না পেচিয়ে ইফতারির জন্য প্রস্তুত হয়ে নিতাম। পিচ্চিরা দাদির সাথে তাঁর ঘরে বসতাম। মহিলারা রান্না ঘরে আর পুরুষরা বসত বৈঠকখানা বা বাইরের ঘরে।

খেজুর, ছোলা ভুনা, মুড়ি, ডালের বড়া বা বেগুনী, সেমাই, সুজি বা জিলাপি। সাথে শশা বা কোন মৌসুমি ফল। আর আখের গুড়ের শরবত ছিল মাস্ট! সাধারণত এ গুলোই থাকত ইফতারির মেনুতে।

একটা এ্যালুমিনিয়ামের বালতিতে আখের গুড় আর সুগন্ধি কাগজি লেবুর রস দিয়ে ১০/১২ লিটার শরবত করা হত। লেবু না পেলে লেবুর পাতা চটকে দেয়া হত। মাঝে মধ্যে চাচারা আড়ত থেকে বরফের চাড় কিনে নিয়ে আসতেন, শরবত ঠান্ডা করার জন্য। অনেক সময় গাছ থেকে ডাবও পাড়া হত। চৌবাচ্চার পানিতে ডোবানো ডাবগুলো যখন কাটা হত আমরা অধীর হয়ে বসে থাকতাম ডাবের সর খাবার জন্য!

আমরা, পিচ্চিরা যেদিন রোজা রাখতাম সেদিন আমাদের রীতিমত ভিআইপি ট্রিট দেয়া হত। কোন কাজের জন্য হুকুম করা হত না। দিনের বড় একটা অংশ ঘুমিয়ে থাকতে বলা হত। ‘বড়দের’ মত করেই ইফতারির প্লেট সাজিয়া দেয়া হত।

প্রায়ই আত্মীয়-প্রতিবেশীদের বাড়িতে ইফতার পাঠানো হত। আমাদের কাজ ছিল এগুলো পৌছে দেয়া। ভীষণ আনন্দের একটা কাজ ছিল।

একদিন বাড়িতে সব আত্মীয়-পরিজনদের নিয়ে ইফতার করা হত। সেটাও ছিল বড় আনন্দের দিন!

‘সাইমুম শিল্প গোষ্ঠী’-র একটা এ্যালবাম ছিল রোজার ওপর করা নাশিদ নিয়ে। দাদি এবং আমাদের ভীষণ প্রিয় ছিল। বারবার শুনতাম আমরা। ঐ এ্যালবামের শেষে অল্প একটু কুরআন তিলাওয়াত ছিল। দাদি খুব পছন্দ করতেন। তখন তিলাওয়াতের অডিও এত সহজলভ্য ছিলনা। আমাদের মফস্বলে তো না ই!

রোজার মধ্যে সবাই একটু বেলা করেই উঠত। আম্মা বেশ দীর্ঘ সময় কুরআন তিলাওয়াত করে তারপর কাজকর্মে যেতেন। চাচীরা সবাই মিলে কোটা-বাছা করে রাখতেন। জোহরের নামাযের পর শুরু হত রান্না-বান্না।

তখন ২৭শে রমজান কে ক্কদরের রাত ধরা হত। এদিনের জন্য সবাই বিশেষ প্রস্তুতি নিতেন। তাড়াতাড়ি রান্না-খাওয়া সারা হত। বাড়ির প্রায় সকলেই সারারাত ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। আমরাও বড়দের সাথে নামাযে দাড়াতাম। ঘরে সুগন্ধি আগরবাতি জ্বালানো হত।

রোজার ভেতর আমাদের মা-চাচীদের যে কাজটা আমার এখনো ভীষণ ভাল লাগে তা হচ্ছে, আমাদের বাড়িতে সব সময়ই একজন বয়স্ক, অস্বচ্ছল মানুষকে পুরো মাস ইফতার করানো হত এবং রাতের খাবারও দিত। এখনো সেটা চলমান, আলহামদুলিল্লাহ।

আরেকটা প্রিয় বিষয় ছিল, আমাদের মহল্লার মসজিদে প্রতিদিন ইফতারের আয়োজন করা হত। মসজিদ কমিটি থেকে লিস্ট করা হত। প্রতিদিন এক বা একাধিক পরিবার মসজিদে ইফতার দিত। যে কেউ এখানে ইফতার করতে পারত।

অধিকাংশের আপত্তির কারণে ব্যাবস্থাটা উঠে গেছে। মনে হলে ভীষণই খারাপ লাগে।

আরেকটা চমৎকার আয়োজন ছিল। প্রতি রমজানে মসজিদ থেকে কুইজের আয়োজন করা হত। বাচ্চাদের জন্য একটা, আরেকটা উন্মুক্ত। আমি বেশ কয়েকবার বিজয়ী হয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। সে বড়ই মধুর স্মৃতি। এটাও এখন আর হয়না।

রোজার মাসের সাথে আমার সবচে কষ্টের স্মৃতিও লেগে আছে। এক রমজানের ২৪ তারিখ দাদি মারা গিয়েছিলেন। দাদি ছিলেন আমাদের বাড়ির প্রাণ, আমাদের সব কিছুর মধ্যমণি। তাঁর সাথে চলে গিয়েছে আমার শৈশবের একটা অংশও। আল্লাহ আমার দাদিকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন।

আমরা বড় হতে হতে সব কিছুই বদলে যেতে শুরু করল।

আমাদের যৌথ পরিবার ভেঙে গেল। সবাই যার যার মত হয়ে গেল। ঘরে ঘরে টিভি-কম্পিউটার-মোবাইল এসে গেল। ইফতারির প্লেট সমৃদ্ধ হতে থাকল। আয়োজনে আভিজাত্য বাড়তে লাগল। কিন্তু রোজার যে রুহানিয়াত ছিল সেটাই যেন হারিয়ে গেল! তখন আমরা অনেক কাজ করতাম যেগুলো শুদ্ধ না। যেমন: শুধু ২৭শে রমজানের রাত কে ক্বদরের রাত ধরা, রোজার জন্য মুখে নিয়ত পড়া ইত্যাদি। তবু তখন যেটুকু জানত সবাই খুব মন দিয়ে আন্তরিকতার সাথে মানতে চেষ্টা করত। এখন আমরা অনেক জানতে পারছি কিন্তু সব কিছুই কেমন অন্ত:সার শূন্য হয়ে যাচ্ছে। না খেয়ে থাকা (দাদি নামায না পড়ে রোজা রাখলে বলতেন, ‘উপোস’ রয়েছে) আর ঈদ শপিংয়েই যেন সব সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে! অথচ উল্টোটা হওয়ার কথা ছিল।

আমি খুব, খুব মিস করি আমার শৈশবের সেই রোজার দিন গুলোকে। সেই আখের গুড়ের মধ্যে লেবুর পাতা চটকে দেয়া শরবতের স্বাদ এখনো আমার মুখে লেগে আছে। মনে হয়, এই যেন সেদিন ভোররাতে দুধ-ভাত খেয়ে দাদির সাথে বসে রোজার নিয়ত করছি। মেসওয়াকের জন্য আইসকেলের ডাল কেটে আনছি…..

আল্লাহ আমাদের রামাদান পর্যন্ত পৌছার তাওফিক দিন। আর এই রামাদান কে জীবনের শ্রেষ্ঠ রামাদান হিসেবে কবুল করে নিন।

Leave a Reply