Skip to content Skip to footer

Allama Muhammad Ali Sabuni Rahimahullah

“তার চেহারা সত্যিই নূরময়। একবার তাকালে চোখ ফেরাতে পারবেন না আপনি।”

আল্লামা মুহাম্মদ আলী সাবুনী রহ. এর অবয়ব বর্ণনায় এমনটাই বলেছেন দারুল উলুম নিউক্যাসলের প্রিন্সিপাল মাউলানা ইসমাইল আকু। মহান আল্লাহ কেবল আল্লামা সাবুনী রহ. এর চেহারাই নূরময় করেন নি। তার হৃদয়ে ঢেলে দিয়েছেন কুরআনের নূর।

.

প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা সাবুনী রহ. দুনিয়ায় পদার্পন করেন ১৯৩০ সালে, উত্তর সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে। তার পরিবারও ইলমি নূরে উদ্ভাসিত ছিল। ছোটকালে পিতা শাইখ জামিলের কাছেই তিনি ইসলামের উত্তরাধিকার আইন এবং ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি পবিত্র কুরআনের হিফযও করে ফেলেন কিশোর বয়সেই।

আল্লামা সাবুনী রহ. যেসব উলামায়ে কিরামের সান্নিধ্য লাভ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন,

→শাইখ মুহাম্মাদ নাজিব সিরাজুদ্দীন

→শাইখ আহমাদ আল শামা

→শাইখ মুহাম্মদ সা’য়ীদ আল ইদলিবি

→শাইখ মুহাম্মাদ রাগীব আত তাব্বাখ

→শাইখ মুহাম্মাদ নাজিব খায়াত্বাহ প্রমুখ…

তার উস্তাজগণের পরিচিতিই বলে দেয়, আল্লামা সাবুনী কেমন ব্যক্তিত্বের মানুষ ছিলেন। এ ব্যাপারে  শাইখ শোয়াইব আহমেদ, প্রিটোরিয়া বেইজড লেখক ও আলিম, বলেন-

“আমরা যদি উপলদ্ধি করি তার উস্তাজরা কত বড় মাপের উলামা ছিলেন তবে আমরা আল্লামা সাবুনীকেও বুঝতে পারব, কেমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন তিনি।”

আল্লামা সাবুনীর একজন বিশেষ উস্তাজের ব্যাপারে মাওলানা শোয়াইব বলেন,

“তার উস্তাজদের মধ্যে একজন ছিলেন আল্লামা মুহাম্মাদ নাজিব সিরাজুদ্দীন। তিনি কুরআনের উপর বড় পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন।”

যাহোক, আল্লামা সাবুনী রহ. মসজিদে মসজিদে ঘুরতেন ইলমের অন্বেষণে। তিনি মাদরাসাহ আল তিজারিয়্যাহ-তে ভর্তি হয়ে সেখানে এক বছর পড়াশুনা করে চলে আসেন। কারণ, সেখানের অর্থ লেনদেন ছিল সুদভিত্তিক। এরপর ভর্তি হন ‘খাসরাওয়িয়্যাহ স্কুল অব শরিয়্যাহ’ নামের প্রতিষ্ঠানে। সেখানে সুনামের সাথে পাস করার পর চলে যান মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে শরীয়াহ ফ্যাকাল্টি হতে ১৯৫২ সালে গ্র‍্যাজুয়েশন করেন। পরে আরো দুই বছর বিশেষ কোর্সের উপর পড়াশুনা করেন।

এরপর আলেপ্পোতে ফিরে এসে অর্জিত ইলম ছড়িয়ে দিতে বেছে নেন শিক্ষকতা পেশা। আট বছর এভাবে তিনি উস্তাজের ভূমিকায় কাজ করে যান।

.

পরবর্তীতে তিনি সৌদি আরবের উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় ও কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়ে উস্তাজের দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে অধ্যাপনা করেন ২৮ বছর। সেখান থেকে তার তত্ত্বাবধানে বহু বিখ্যাত স্কলার গড়ে উঠেছেন। তারা দুনিয়াব্যাপী ইলমী খিদমতে নিজেদের নিয়োজিত করেছেন।

.

আল্লামা সাবুনী রহ. অত্যন্ত জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ হওয়ায় বিভিন্ন ক্লাসিক্যাল বইয়ের পাঠোদ্ধার, সম্পাদনা ও গবেষণার দায়িত্ব পেতেন বিশ্ববিদ্যালয় হতে। আল্লামা সাবুনী রহ. ছিলেন বহুগ্রন্থ প্রণেতা। তার রচিত বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর অন্যতম হল-

→সফওয়াতুত তাফাসীর

→ক্বাবাস মিন নুরিল কুরআনিল কারিম

→আত-তাফসীরুল ওয়ামিল মুয়াসসার

→রওয়াইউল বয়ান ফি তাফসিরি আয়াতিল আহকাম

→মুখতাসারু তাফসিরু ইবনে কাসির

→আত তিবয়ান ফি উলুমিল কুরআন

→মুখতাসারু তাফসীরে তাবারী ইত্যাদি..

.

এটা সত্য, সকল আলেমই আলমে ইসলামীর স্থায়ী সম্পদ। মৃত্যুর পরেও তারা জীবিত থাকেন তাদের কর্মের মধ্যে। শত-হাজার বছর পরও জগৎ তাদের মনে রাখে। তবে তারা বিভিন্ন মাসলাকের হন। কেউ হানাফী, কেউ হাম্বলী। কেউ শাফে’য়ী, কেউ মালেকী আবার কেউবা সালাফী। আল্লামা সাবুনী রহ. ছিলেন হানাফী স্কুল অফ থটের বিজ্ঞ আলেম। এ বিষয়ে মাওলানা আকু বলেন,

“তিনি সত্যিই মহান ব্যক্তি ছিলেন। পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ উলামাদের সান্নিধ্য। আর হ্যা, তিনি তাকলীদ করতেন। ছিলেন পুরোদস্তুর হানাফী স্কলার। তিনি ছিলেন আমাদের স্বাপ্নিক ব্যক্তিত্ব।”

তিনি আরো বলেন,

“আল্লামা সাবুনী রহ. চতুর্মুখী জ্ঞানের মানুষ ছিলেন। তাফসীরে ছিল তার অসাধারণ দক্ষতা। তিনি উত্তরাধিকার, আকীদাহ, সীরাহ ইত্যাদি বহুবিধ  বিষয়ে লিখেছেন। এভাবে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ইলমি স্বাক্ষর রেখেছেন। আর তালিবে ইলমরা তার এসব লিখনী খুজে বেড়ায়।”

.

আল্লামা মুহাম্মদ আলী সাবুনী রহ. তার জীবনে কতিপয় বিখ্যাত ইলমি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। যেমন- উম্মুল ক্বুরা বিশ্ববিদ্যালয় ও কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান। তিনি সিরিয়ার উলামা সংঘের প্রধান ছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এওয়ার্ডে ভূষিত হন ইসলামের প্রতি তার খিদমতের জন্য।

.

আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, আল্লামা সাবুনী রহ. ছিলেন সিরিয়ান স্কলার। সিরিয়ার চলমান যুদ্ধ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল, সে সম্পর্কেও আমাদের জানা প্রয়োজন। সিরিয়ার চলমান যুদ্ধে মজলুমের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন আল্লামা সাবুনী রহ.। ২০১১ সালে যখন আরন বসন্ত শুরু হয়, মজলুমেরা যখন ইনসাফ ও আদালতের হুকুমাত প্রতিষ্ঠায় বিপ্লবী ভূমিকা রাখতে শুরু করে, আল্লামা সাবুনী রহ. তখন আরব বসন্তের পক্ষেই অবস্থান নেন। কতিপয় টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন,

“যে শাসক তার জনগণের উপর জুলুম করে, আল্লাহর দ্বীন থেকে বিচ্যুত করে, সে অপরাধী এবং অবশ্যই তাকে প্রতিহত করতে হবে।”

সিরিয়ার জালেম বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে চলা আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন তিনি। বাশার আল আসাদের জুলুমের প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন তিনি। তাকে “মুসাইলামাতুল কাজ্জাব” ঘোষণা দিয়ে জনগণের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন মহান এই দা’য়ী ইলাল্লাহ। তিনি বলেছেন,

“উম্মাহের স্কলারগণ মুসাইলামাতুল কাজ্জাব এই বাশার আল আসাদের  সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করেছেন। সে জুলুম নির্যাতন করেছে এবং হত্যা করেছে নিরপরাধ মানুষদের।”

.

আল্লামা সাবুনী রহ. অসাধারণ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত জীবন পার করেছেন এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আল্লাহ সবাইকে মৃত্যু দান করেন। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় আল্লামা মুহাম্মদ আলী সাবুনী রহ. ১৯ মার্চ, ২০২১ সন, জুমুআ’র সালাতের চার ঘন্টা আগে তুরস্কের ইয়োলোভা শহরে ইন্তেকাল করেন। মহান আল্লাহর রহম ও বরকতের প্রাচুর্যে তাঁর অভিষেক হয়।

তার মৃত্যুর সংবাদে বিশ্বের প্রখ্যাত স্কলারগণ শোক প্রকাশ করেন। তার জন্য রহমত ও ক্ষমার দুআ করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, আল্লামা ইউসুফ আল ক্বারদাওয়ী, ড. আব্দুল করীম বাক্কার, মুহান্না আল হুবাইল, জাবির আল হারমি, মিজানুর রহমান আজহারী প্রমুখ। আল্লামা ইউসুফ আল কারদাওয়ী বলেন,

“আমাদের ভাই শাইখ মুহাম্মাদ আলী সাবুনী, সিরিয়ার রাবেতাতুল উলামার প্রেসিডেন্ট, আমাদের যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুফাসসির। আল্লাহর কাছে আর্জি, তিনি যেন তাকে ক্ষমা করে দেন, তাকে রহম করেন। ইসলাম, দাওয়াত ও উম্মাতের প্রতি তার খিদমতের বিনিময় যেম আল্লাহ তাকে দান করেন। এমন শ্রেষ্ঠতম বিনময়, যা সত্যপন্থী দা’য়ী এবং কর্মমুখর আলিমদের দেয়া হয়ে থাকে।”

তার মত বিশ্বের অন্যান্য স্কলারগণও শোক প্রকাশ করেছেন। তার মৃত্যুকে তারা চিহ্নিত করেছেন “জালিম শাসকের সম্মুখে হকের আওয়াজ হারিয়ে যাওয়ার” সাথে।

আল্লামা সাবুনী রহ. এর জানাযা হয় তুরস্কের বিখ্যাত মসজিদ, সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ মসজিদ প্রাঙ্গণে। হাজারো আলিম ও তালিবে ইলমরা এই জানাযায় অংশ নিয়েছেন। যুগের মহান এই দা’য়ীকে দাফন করা হয়েছে ইস্তানবুলের এফেন্দী সেন্টারে। ২০ মার্চ, ২০২১ সনে।

.

আল্লামা মুহাম্মদ আলী সাবুনী রহ. এর জীবন সম্পর্কিত এই আলোচনার শেষে তাঁর একটি অলৌকিক বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই, যা বর্ণনা করেছেন তারই শাগরেদ মাওলানা ইসমাইল আকু। তিনি বলেন,

“আমি তাকে লিখতে দেখেছি। তিনি কলম ছেড়ে দিলে (বার্ধক্যের কারণে) তার হাত কাঁপত। আবার কলম ধরলেই হাতের কাঁপুনি থেমে যেত। এটা বিস্ময়কর ব্যাপার। এমনকি নিজের এ বিষয়টিকে আল্লামা সাবুনী রহ. অলৌকিক বলতেন।”

……

|| আল্লামা মুহাম্মদ আলী সাবুনী রাহিমাহুল্লাহ : বরেণ্য মুফাসসিরের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটুখানি ||

—মুহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ

……

Leave a Reply